245239

শুধু শখের বসে নয় প্রয়োজনের তাগিদেও

অনলাইন সংস্করণঃ- মেহেদি শব্দটি সংস্কৃত শব্দ মিনধিকা (Mendhika) থেকে নেয়া হয়েছে। মেহেদির রং মূলত বাদামি হলেও সারা বিশ্বে সাদা, লাল, কালো, স্বর্ণালি রঙের মেহেদি দেখতে পাওয়া যায়। সেই প্রাচীনকাল থেকেই মেয়েরা তাদের সৌন্দর্র্যের একটি বড় উপকরণ মনে করেন এ মেহেদিকে।

মেহেদি মেয়েরা মূলত হাতেই পরেন, তবে কেউ কেউ এটি পায়েও পরে থাকেন। মেয়েদের পাশাপাশি অনেক দেশের অনেক পুরুষও এ মেহেদি হাতে, চুলে ও দাড়িতে লাগিয়ে থাকেন। সুদানে শান্তিমিশনে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় জেনেছিলাম মেহেদি শুধু মেয়েদের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এর ব্যবহার থেকে বিবাহিত-অবিবাহিত মেয়েদেরও চেনা যায়। সুদানে যেসব মেয়ে দুই হাতে মেহেদি পরেন তারা বিবাহিত, আর যেসব মেয়ে এক হাতে মেহেদি পরেন তারা অবিবাহিত।

মেহেদি শুধু আমাদের দেশেই খুব জনপ্রিয় তা নয়, এ উপমহাদেশ, আফ্রিকা মহাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যে ভীষণভাবে জনপ্রিয়। মেহেদি শুধু মেয়েদের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে তা নয়; এটি মেয়েদের সুস্থ ও সুন্দর মন-মানসিকতারও বাহক-ধারক। মেহেদি নকশায় একজন শিল্পী তার সৌন্দর্যের মননশীলতার ও নিত্যনতুন নকশার আবির্ভাব ঘটান। তাই যুগ যুগ ধরে মেহেদির নকশার ধারার পরিবর্তন অব্যাহত রয়েছে।

গত ঈদের দিনের আগের দিন অর্থাৎ চাঁদরাতের দিন সপরিবারে ইফতার খেতে সীমান্ত স্কয়ারে গিয়েছিলাম। ইফতারের সময় তখনও এক ঘণ্টা বাকি। আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে শপিং মলে ঘোরাফেরা করছি সময় কাটানোর জন্য। আমার ছোট মেয়ের ডাকে চোখ ফেরাতেই সে আমাকে বলল, বাবা- মা আর আমি হাতে মেহেদি দেব।

প্রশ্ন করতেই হাতের ইশারায় আমার মেয়ে কয়েকজন মেয়ের দিকে তাকাতে বলে বলল, ওইখানে আপুরা মেহেদি দিচ্ছে, আমি আর মা ওইখানেই মেহেদি দেব- আর তোমাদেরও সময় কেটে যাবে। সপরিবারে মেয়েদের কাছে গেলাম, ওরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

মজার বিষয় হল, ওরা সবাই বসে আছে টুলের ওপর। কাস্টমার অর্থাৎ যারা হাতে মেহেদি পরবেন তাদের জন্য সামনে একটি টুল। ছয় থেকে সাতজন মেয়ে এরই মধ্যে মেহেদি পরাতে ব্যস্ত। মাঝে একজন একটি ছোট বাক্স নিয়ে ম্যানেজারের ভূমিকায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার স্ত্রী ও মেয়ের হাতে মেহেদি দেয়ার সময় এলো, আমি আমার দু’ছেলেকে নিয়ে শপিং মলের ইফতার শপে ইফতারের আগেভাগেই অর্ডার প্লেস করতে গেলাম।

সত্যিই এ এক বিচিত্র ও সুখকর অনুভূতি, আবেগাপ্লুত হওয়ার অনুভূতি। আমাদের সংস্কৃতিকে লালন ও ধারণ করার এক অপূর্ব প্রচেষ্টা। আগের দিনে মা, চাচি অথবা ভাবিরা ছোট মেয়েদের ঈদ, বিয়ে ও বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানের সময় হাতে মেহেদি পরিয়ে দিতেন। আজ সে প্রথা চালু থাকলেও শহরের ব্যস্ততম জীবনে অনেকেই পার্লারে গিয়েও হাতে মেহেদি আঁকেন। আগের দিনে হাতের মেহেদিতে নকশার ছাপ ও বৈচিত্র্যের চেয়ে বর্তমান যুগের বিভিন্ন নকশার ছাপ চোখে পড়ার মতো। তবে যে বিষয়টি আমাকে আশা জাগিয়ে, ভাবিয়ে তোলে তা হল, এসব শিক্ষার্থী শুধুই কি শখের বসে আমাদের মেয়েদের হাত মেহেদির রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে? সব ক্ষেত্রেই হ্যাঁ বলা মোটেই ঠিক হবে বলে মনে হয় না। আজকের যুগে শিক্ষার ব্যয় বহুগুণে বেড়ে চলেছে। শিক্ষার উপকরণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় মেটানো সাধারণ আয়ের মানুষের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জের বিষয়। তাই এসব শিক্ষার্থী যদি এসব উপলক্ষে কিছুটা হলেও অর্থ রোজগার করে নিজেদের সামান্য হলেও চালাতে সক্ষম হয়, তাহলে তো ভালোই হয়।

২১ ফেব্রুয়ারির দিন ছোট ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে গিয়েছিলাম শহীদ মিনার দেখাতে, ওরা দুজনই ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। বিশ্বকে-দেশকে জানার দু’জনেরই ভীষণ আগ্রহ। প্রায়ই নানা বিষয়ে নানা প্রশ্নে আমি জর্জরিত হই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতেই একজন শিক্ষার্থী রং-তুলি হাতে নিয়ে এসে বলল, স্যার- ওদের মুখে বাংলার পতাকা ও শহীদ মিনার এঁকে দেই? মাথা নাড়িয়ে সায় দিতেই একচিলতে মিষ্টি হাসি দিয়েই আঁকা শুরু। পেমেন্ট শেষ হতেই দৌড়ে আরেক কাস্টমারের সামনে।

সত্যিই দুটো জায়গায়ই খুব আনন্দ পেয়েছি, ওরা যা চেয়েছে তা-ই দিয়েছি। শিক্ষার্থীদের বাড়তি আয়ের সুযোগ দেখে খুবই আত্মতৃপ্তিতে মন ভরে উঠেছিল।

বিদেশে আমাদের অনেক বড়ঘরের ছেলেমেয়েরা পড়তে যায়। তারা শিক্ষার খরচ মেটাতে নানা ধরনের পার্টটাইম চাকরি করে থাকে। এরকম শিক্ষার্থী একজনের সঙ্গে কথা হল, তারা এতে দোষের কিছু নেই বলেই মনে করে, কাজটাকে প্রাধান্য দেয়, শ্রদ্ধা করে, রোজগার করে নিজের খরচ মেটায়। আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের টিউশন করা ছাড়া আর যেন কোনো কাজ মানায় না। অনেককে আবার শিক্ষার্থীদের এ ধরনের কাজ করতে দেখে ভ্রু কুঁচকাতে দেখেছি। তারা তর্কে ও যুক্তিতে না পারলে শেষমেশ মেয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ‘এ ধরনের কাজ না করলেই তো চলে’ বলে চলে যায়। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের দেশে ভিন্ন। একজন মেয়ে শিক্ষার্থী যদি সরকারি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেন তো ভালো। আর যে মেয়ে শিক্ষার্থী সরকারি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারল না, তার আর্থিক ও মানসিক অবস্থা ভেবে দেখা দরকার। তাই দেশে পার্টটাইম চাকরি খুবই দরকার, যার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী কিছুটা হলেও তার খরচ চালাতে সক্ষম হবে। এতে করে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটবে। এ ক্ষেত্রে সমাজের ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এগিয়ে আসার আহ্বান করছি।

একজন শিক্ষার্থীর টিউশন ফি ও শিক্ষার উপকরণ সহজলভ্য করতে হবে অথবা তাকে এমন কিছু উপায় আমাদের সমাজকে বের করে দিতে হবে, যাতে করে সে সেগুলো নিজেই অর্জন করতে পারে। একজন মফস্বল/গ্রামের অভিভাবক তার মেয়েকে ঢাকার কোনো ইউনিভার্সিটিতে পড়ার জন্য পাঠাবেন- সে সময় এসব অভিভাবককে মানসিক চাপের বিষয়টি নজরে এনে মেয়েদের জন্য আবাসিক হল ও সুলভমূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি। রাজধানী ও প্রতিটি বিভাগীয় শহরে মেয়েদের একাধিক হোস্টেল চালু করা ভীষণ প্রয়োজন। গ্রাম থেকে আসা এসব শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে যখন চাকরিতে যোগদান করবে, তখন তাদের জন্য কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলও প্রয়োজন। বর্তমানে সরকার নারীর উন্নয়নে ও ক্ষমতায়নে অত্যন্ত সজাগ এবং বহুবিধ পদক্ষেপও নিয়েছে এবং প্রতিনিয়তই নিচ্ছে। আমরা আশা করব, সরকার মেয়ে শিক্ষার্থীদের ও কর্মজীবী মেয়েদের জন্য রাজধানী এবং বিভাগীয় শহরে আরও বেশকিছু হোস্টেল নির্মাণ ও পরিচালনা করার বর্তমান প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

বর্তমান সরকার শিক্ষার উন্নয়নের জন্য অনেক কিছু করছে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি কলেজে পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের বিনা মূল্যে পড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সরকারের এসব উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। সশস্ত্র বাহিনীতে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মেয়েদের অন্তর্ভুক্তি দেশসেবায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছে। দেশের প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ অনেকাংশে বেড়েছে। কর্মসংস্থানের এসব নতুন সুযোগ সমাজে মেয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আরও মনোযোগী করে তুলেছে।

আমার দৃষ্টিতে সমাজের এ শিক্ষার্থীদের জন্য এ ধরনের আরও নানা কাজের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এ ধরনের পার্টটাইম চাকরি শিক্ষার্থীদের যেমন সচ্ছল করবে, তেমনি বাজে কাজ ও নেশায় জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখবে। তাই আসুন, আমরা আমাদের আপনজনের হাত মেহেদির রঙে রাঙিয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের মনকে বিকশিত করি, ওদের দিয়ে জাতীয় পতাকা গালেই শুধু নয়, হৃদয়ে আঁকিয়ে নেই- শহীদ মিনারকে শুধুই গানে নয়, হৃদয়ে, চিন্তায় ও চেতনায় স্থান দেই।

মো. সাইফুল ইসলাম : লে. কর্নেল, সেনাসদর, কিউএমজির শাখা (এসটি পরিদফতর)

 

সূত্র যুগান্তরঃ

পাঠকের মতামত

Comments are closed.